বাঁদনার ইতিবৃত্ত

রাকেশ সিংহদেব প্রকৃতি প্রেমের আরেক নাম।ভালোবাসার কোনও বাটখারা হয় না তা লেখকের সাথে না যাপন করলে বোঝা বড্ড দায়।মূলত রাকেশ একজন ছবিওয়ালা।আর তার চর্চার আধার সেই সব অবলা জীবজন্তু পশু পাখি।নিয়মিত লেখেন বিভিন্ন বানিজ্যিক পত্রিকায়।এই মুহূর্তে কাজ করছেন হাতি নিয়ে।বিভিন্ন “পরিবেশ বাঁচাও” সংস্থার সাথে জড়িয়ে ফেলেও তিনি নিরঙ্কুশ।একক।তিনি জানেন ভালোবাসতে ফেরৎ পেতে নয়।ইনি বাইফোকালিজমেরও অন্যতম সদস্য।

 

বাঁদনার ইতিবৃত্ত 

রা কে শ   সিং হ দে ব 

কথায় আছে – “বহু কাঠে মহুল সিঝে / আর বহু কথায় কুড়মি বুঝে।”
কিন্তু, এই লেখা আমার কুড়মিদের জন্য শুধু নয় বরং এই লেখা আপামর বাংলা ভাষাভাষী সমস্ত মনুষের জন্যও। তাই যৎসামান্য কথায় তুলে ধরবার চেষ্টা করব এই সুদীর্ঘকালের টোটেমিক উপজাতি প্রসঙ্গে। এক নীরব উপজাতি। যারা হাজার হাজার বছরের বঞ্চনা আজও পিঠ পেতে নিয়ে বয়ে চলেছে। এই প্রচলিত সমাজে থেকেও তাদের ভিন্নতর সমাজ, ভিন্নতর ভাষা বৈভব ও সংস্কৃতি। সে এক অন্যধারার কুড়মি। তাদের নেগ-নেগাচার, আচার-বিচার, কথ্য-অকথ্য সবকিছু নিয়ে কুড়মি ও কুড়মালি ভাবধারা। যারা আজও নিজেদের অক্লেশে সমর্পন করে প্রকৃতির কোলে। তাদের চোখে প্রকৃতির বাইরে কোনও কিছুই নয়, না দেব-দেবী না পরব তেওহার আর না নেগ-নেগাচার। তাই তাদের জীবন বোধ ও শৈলী আবর্তীত হয় এই একক কুণ্ডলি জুড়ে। প্রাক্‌বৈদিক যুগের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা সিন্ধু সভ্যতা। এযাবৎ কাল পর্যন্ত গবেষনাতে, সমীক্ষাতে উক্ত কৃষিভিত্তিক সভ্যতার যতটুকু নিদর্শন পাওয়া গেছে তার সবটুকু এখনও কুড়মি জনজাতির মানুষ তাদের আচার সংস্কৃতিতে ধারন করে রেখেছে। বহন করে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ধারায়। কুড়মালি সংস্কৃতি কর্মযোগ আধারিত কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতি। কুড়মালিতে একটি প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে-
“ রাউত চিনহাঁই জাইত / চারিঁই চিনহাঁই পাঁইত। ”
অর্থাৎ, ভাষাতে জাতির পরিচয় মেলে আর সংস্কৃতিতে মেলে শ্রেণীর পরিচয়। কোনও জাতির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তার জীবন জীবিকার উপর নির্ভর করে। কুড়মি জাতির সংস্কৃতি মূলত অনুষ্ঠানমূলক সংস্কৃতি। এই সগস্কৃতিতে রয়েছে বারো মাসে তেরো পার্বণের উদাহরন। এই তেরো পরবের সবকটিই কৃষি আধারিত, কৃষি বিষয়ক এবং কৃষিমূলক উদযাপনের উৎসব।
সিংভূম, মানভূম তথা অধুনা সীমান্তবাংলার মহুল, শাল, পলাশ ঘেরা ভূখন্ডের কৃষিজীবী গরীবগুর্বো মানুষের প্রাণের উৎসব বাঁদনার, শব্দগত উৎপত্তি সম্পর্কে নানা পণ্ডিতের নানা মত। কিন্তু এই পরবের আচার-ক্রিয়াকর্মগুলোর প্রতি নজর রাখলে বোঝা যায় আসলে ‘বন্দনা’ থেকেই ‘বাঁদনা’ কথাটি এসেছে। আসলে গরু-মহিষ গবাদিপশু ও বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি হলো কৃষিকাজের প্রধান অবলম্বন। জল-জঙ্গল-জমিন কেন্দ্রিক জীবনযাত্রায় উৎপাদনের হাতিয়ার গবাদি পশুর সঙ্গে কৃষি যন্ত্রপাতির অবদানের কথা স্মরণ রেখে কৃষি কাজে নিযুক্ত কুড়মি জনগোষ্ঠীর মানুষজন তাদের ধন্যবাদ জানাতে বাঁদনা পরব পালন করে। এটা আসলে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভাবধারায় সম্পৃক্ত ‘Thanks giving Festival’। বাংলার পশ্চিমাঞ্চলের টোটেমিক কুড়মি জাতির অন্যতম প্রধান উৎসব হল বাঁদনা, এই নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কুড়মি জাতির সংখ্যাধিক্য ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের কারণেই এই পরব আজ একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সম্প্রসারিত হয়েছে সমষ্টির মধ্যে। রীতি অনুযায়ী কার্তিক অমাবস্যার পূর্বদিন থেকে মোট পাঁচ দিন ব্যাপী বাঁদনার মৌতাতে ম-ম করে বাতাস। গৃহস্থের গোবর নিকানো উঠোনে হাজির হয়- ঘাওয়া, অমাবস্যা, গরইয়া, বুঢ়ী বাঁদনা ও গুঁড়ি বাঁদনার মতো নেগাচারে সমৃদ্ধ বাঁদনা পরবের উৎসবমুখর দিনগুলি।

 

মোড় তৈরির জন্য ধানশিস আহরণ

কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথি থেকে ‘বাঁদনা পরব’-এর সূচনা হলেও তার প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়ে যায় সপ্তাহ আগে থেকেই। বর্ষার ক্ষত সারিয়ে মাটির বাড়ি দেওয়াল নতুন মাটি গোবর লেপে মেরামত করা হয়। বিশেষভাবে গোয়ালঘরগুলিকে পরিস্কার ও মেরামত করা হয়। ঘোরের উলুটি করা দেওয়ালে আঁকা হয় নানা রঙিন ছবি। পরবের দিনগুলি পাইন্যা লতার রসের সাথে পিটুলি গুলে চার আঙুলের দ্বারা আঁকা হয় চিত্র বিচিত্র আলপনা।

*অমাবস্যায় পালিত হওয়া নেগাচার*

গুঁড়ি কুটা ঢেঁকিতে

*কাঁচি দুয়ারি* : অমাবস্যার দিনে ঘরদোর পরিস্কার এবং পিঠে তৈরির তোড়জোড় করার পরে দিগন্তরেখায় সূর্য মুখ লুকোলেই শালপাতায় চালগুঁড়োর পিণ্ড বানিয়ে, তাতে পরিমাণ মতো বিশুদ্ধ গাওয়া ঘি ঢেলে- তারপর কাপাস তুলোর সলতে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। দুয়ার, আঙিনা, নির্মীয়মান খামার সর্বত্র টিমটিম করে জ্বলে ঘৃতপুষ্ট অগ্নিশিখা। এর পোষাকী নাম ‘কাঁচি দুয়ারি’ বা ‘কাঁচি জিওরি’। এই অনুষ্ঠানটি অমাবস্যার দিনের প্রধান কাজ। অমাবস্যা তিথির পরিবর্তণ ঘটলে এই অনুষ্ঠানের পরিবর্তন ঘটে। এরপর বাড়ির কর্তা শুচিশুভ্র হয়ে নতুন ধুতি পরে গাই বলদের শিঙে কচড়া তেল মাখিয়ে দেন। গোয়ালঘরের কড়িকাঠে মাটির ছিদ্র করা হাঁড়িতে ঝোলানো হয় জাগর প্রদীপ। লোকবিশ্বাস আলো ঝলমল গোয়ালঘরে গগবতীদের পরিদর্শনে আসেন ভগবান বুড়হা বাপ (আদিদেব শিব)।

মোড় গাঁথার কৌশল

*গঠপূজা* : অমাবস্যার দিন (পরবের প্রথম দিন) গাঁয়ের লায়া বা দেহরি দিনভর নির্জলা উপোস করে গ্রাম শেষের রাঙামাটির পথে ৯ টি ঘর কেটে কপিলাসন্তানদের মঙ্গল কামনায় গঠ পূজা করেন, গঠ অর্থাৎ গোরুর পাল।পূজাস্থলে রেখে দেওয়া হয় দেশী মুরগীর ডিম অথবা তার প্রতীক হিসেবে চাল গুঁড়োর মণ্ড। যার বলদের পদাঘাতে সেই ডিম ভাঙে, সেই খামিদকে ভাগ্যবান বলে মনে করা হয়। ভাগ্যবান খামিদ সব গোপালকদের পা ধুইয়ে আদরযত্ন করে ‘গঠ ডেঙ্ঘা’ নামক নেগটি সুসম্পন্ন করেন।

*জাগরণ* : এরপর অমানিশা নামলেই- নিকষ অন্ধকারে(অমাবস্যার রাতে) ভারতের নানা প্রান্তে যখন দীপান্বিতার আলোকসজ্জা আর কালীপূজার উল্লাস, ঝাড়খণ্ডী সংস্কৃতিপুষ্ট বাংলার পশ্চিম প্রান্তে কিন্তু সেসবের বালাই নেই। তবে প্রতিটা গোয়ালঘরে জ্বলে শুভঙ্করী মৃৎপ্রদীপ। গোরু, কাড়ার তেল চকচকে শিংগুলি মায়াবী হয়ে ওঠে পিদিমের আলোয়। রাত গভীর হলে ঢোল, মাদৈলের বজ্র নির্ঘোষে গোসন্তানদের অভিনন্দন জানাতে ঝাঁগড় দলের আবির্ভাব হয়। অমাবস্যা রাতের মূল আকর্ষণ এই ঝাঁগড় দল এবং তাদের অহিরা গান। অমাবস্যা তিথি থাকতে থাকতেই ঝাঁগড় দল রাতের বেলা গ্রামের প্রতিটি কুলহি্‌ ঘর ঘুরে ঘুরে ঢোল মাদল বাজিয়ে অহিরা গান গেয়ে গৃহস্থের গরু কাড়া জাগিয়ে যায়। একজন ঝাঁগড়িয়া কানে হাত দিয়ে অহিরা গীত ধরে, অনুবৃত্তি করে বাকিরা। জাগান শেষ হলে গৃহস্বামী মনানন্দে ঝাঁগড় দলকে আপ্যায়ন করে হাতে তুলে দেন দু’পাঁচ টাকা, দু’এক সের চাল। গিন্নী ঝুলি ভরে পিঠালাঠা (খাপরা পিঠা, ছিলকা পিঠা, গূড় পিঠা, মশলা পিঠা ), মুড়ি চিড়া দিয়ে ঝাঁগড় বিদায় করে। বাঁদনা পরবের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর ‘অহিরা গীত’ বা গানগুলি। তিন ধরনের অহিরা গান আছে। যথা- ক. গরু জাগানোর গান খ. ডহইর্যাা গান – অমাবস্যার রাত্রি তার বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাওয়ার সময় জাহিরা গানগুলি বলে। গ. গরু বা মোষ খেলানোর গান – গরু খুঁটানোর দিন গরুকে উদ্দেশ্য করে যে গান গাওয়া হয়। গ্রাম্য লোককবিদের রচিত, লোকমুখে প্রচলিত অহিরাগুলির মূলভাষা কুড়মালি। পুরুলিয়ার উত্তরাংশে, পশ্চিম মেদিনীপুর, ছোটনাগপুরের হাজারিবাগ, রাঁচীর পাঁচ পরগণা অঞ্চলে প্রচলিত অহিরাতে কখনো ফুটে ওঠে সরল কথায় মানব জীবনের জীবনদর্শন।

গরু চুমানোর তোড়জোড়

*প্রতিপদে পালিত নেগাচার*

*গরঅয়া* : অমাবস্যার পরের দিন প্রতিপদ। এই দ্বিতীয় দিনের প্রধান অনুষ্ঠান ‘গরঅয়া (গরুকে কেন্দ্র করে) পূজা’। বাঁদনার ২য় দিনে পানিয়া লতা মাড়াই করা রসে আতপ লালের গুঁড়ি মিশিয়ে নতুন মাটির তকতকে উঠোনে আঁকা হয় চউক। চউক পুরা অঙ্গনে সাজিয়ে রাখা হয় হাল, জোয়াল। কর্তা পুষ্করিণী থেকে তুলে আনে ডাঁটাসহ শালুক ফুল। কর্ত্রী চালগুঁড়ো দুধে গুলে, নবনির্মিত মাটির চুলোয় ঘিয়ে ছেঁকে তৈরি করে পিঠা। দুধ, গুড়, আতপচাল, পিঠে উপচারে- গোয়ালঘরে পূজিত হন গরাম, ধরম, বসুমাতা, গঁসাইরাই, নাজি লিলঅউরি, গাই গরইয়া, মৈস গরিয়া, ডিনি ঠাকুরাইন ও বড়োপাহাড়। গরাম ঠাকুরের উদ্দেশ্যে লাল মোরগ ও ধরম ঠাকুরের উদ্দেশ্যে সাদা মোরগ, কুদ্‌রা ঠাকুরের উদ্দেশ্যে কালো মোরগ উৎসর্গের মাধ্যমে সমাপন ঘটে গরঅয়ার।
সন্ধ্যাবেলা গৃহকর্তী নতুন শাড়ি পরে গবাদি গরুদের মাথায় নতুন ধানের শীষ দিয়ে তৈরি মোড় বেঁধে দেয়। তারপর যে প্রদীপ দিয়ে বরণ করা হয় সেই প্রদীপকে গৃহকর্তা কুলির মাথায় বা পায়ের ফাঁক দিয়ে তিন বার ঘুরিয়ে বাম পায়ের চাপ দিয়ে ভেঙে দেয়। একে বলে ‘পচ্ছা ভাঙ্গা’। পচ্ছা মানে প্রদীপের অপভ্রংশ রূপ।

*দ্বিতীয়াতে পালিত নেগাচার*

*বুঢহি বাঁদনা* : বাঁদনা পরবের শেষ অনুষ্ঠানের দিনটিকে বলে ‘বুঢহি বাঁদনা’। এই দিনে প্রথমে ঘরদোর গোবর জলে ছড়া দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। দুপুরে সারা উঠোন জুড়ে ‘চোক্‌-পুরা’ বা বড় আলপনা দেওয়া হয়। কৃষিজীবী লোকেদের কাছে বলদ পুত্রস্বরূপ। গৃহস্থের শ্রীবৃদ্ধির জন্য বছরভর অক্লান্ত খাটে এরাও। তাই বাঁদনার এই দিনে প্রহারের বদলে ধান্য নির্মিত হারে বিভূষিত করা হয় কপিলাসন্তানদের। জোয়ালক্ষত কাঁধে পরম মমতায় লাগিয়ে দেওয়া হয় তেল। কাঁচাপাকা ধানের শীষ ছিঁড়ে তৈরি করা হয় অনিন্দ্যসুন্দর মুকুট ও সিঁথলী, পরানো হয় গোরুর মাথায় আর কপালে। স্নেহার্দ্র চিত্তে গবাদি পশুদের পদপঙ্কজ ধুইয়ে দেয় গৃহিণীরা। লাল, নীল রঙে সাজিয়ে দেওয়া হয় গরুর দেহ, কেউ বা এঁকে দেয় নিজের গোষ্ঠীর টোটেম! বাড়ির মহিলারা নতুন শাড়ি পরে,ছেলেরা এক খিলি পান মুখে পুরে, নতুন কুলোয় নৈবেদ্য সাজিয়ে ভক্তিভরে চুমান বাঁদান করে। এই পর্যায়ের নেগাচারের সাথে সাথে হড়দের আত্মপরিচিতির প্রসঙ্গটিও প্রতিভাত হয়েছে নিম্নোক্ত অহিরাটিতে- “ভালা, অহিরে…. কুড়ুমা পাহাড়ে কেরি, কঁচি কঁচি ঘাসঅরে, বাবু হো…. হড়প্পা নগরেক ডমিন, সরু সরু সরু বাঁসিয়াই সুপতি বানাঅ হ, সেই সুপে গেইয়ানি চুমাই।” অশুভ শক্তির হাত থেকে গোধনকে বাঁচাতে বাড়ির রমণীরা একটি মৃৎপাত্রে আগুন সহ ধুনা নিয়ে গিয়ে গাঁয়ের শেষে নেগাচার অনুযায়ী পায়ের আঘাতে সেটি ভেঙে ফেলে। মৃৎপাত্রটি ভেঙে ফেলার রীতিটির পরিভাষাগত নাম ‘নিমছান’। গোয়াল ঘরে দাঁড় করিয়ে গরুর বাগাল রাখালদের মাথায় গৃহকর্ত্রী সরষের তেল ঢেলে দেয় যা তাদের মাথা থেকে পা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে । ঐদিন দ্বিপ্রাহরিক আহারে থাকে মাছ-ভাত। লোকবিশ্বাস এ হলো গৃহস্থের স্বচ্ছতার প্রতীক।

*গরু খুঁটা* : এদিন বিকেলের মূল আকর্ষণ ‘গরু খুঁটা’। এজন্য গরু কাড়াদের বিশেষভাবে যত্ন নেয় বাগালরা। এদিনই শেষ বিকেলে গাঁয়ের প্রান্তে সুপরিসর মাঠে সবাই ভিড় জমায়। শক্ত খুঁটিতে বাঁধা হয় সুপুষ্ট, বলবান, তেজী বলদ আর দুর্দম, উদ্দাম কাড়া। ঝাঁগড়ের তারস্বরে অহিরা আর অভ্রভেদী বাজনা শুনে রোষে ফুলে ওঠে বরদা, কাড়া! সাহসী পুরুষরা বাঁধাড় কাড়ার সামনে মৃত পশুর চামড়া ধরে! সমবেত কুলকুলি শুনে উন্মত্তের মতো ফুঁসে ওঠে খুঁটানো কাড়া খুঁটিকে ঘিরে চরকির মতো পাক খায়, কখনো প্রবল বিক্রমে গুঁতো মারে চর্মখণ্ডে! নিজের আপাত শান্ত বলদটিকে উত্তেজিত করতে, কেউ কেউ কানে আঙুল চেপে অহিরা হাঁকায়- *”ভালা অহিরে…. সব দিন যে চরাই ভালা, বনে জঙ্গলে রে, বাবু হো…. আজি তর দেখিব মর্দানী, আজকার রণে ভালা, জিতি যদি যাবে রে, বাবু হো…. চারিপায়ে নূপুর ছাহাবো।”* আপাত দৃষ্টিতে বলদ খুঁটার মধ্যে কৃষিকর্মে ক্লান্ত, প্রান্তভূমির ব্রাত্যজনদের চিত্তবিনোদনের দিকটি পরিলক্ষিত হলেও, অনেকের মতে এটি এই অঞ্চলের আদিম অধিবাসীদের জীবন সংগ্রামের ইতিহাসের চলমান দলিল। অরণ্য বেষ্টিত এই ভূখণ্ডটি ছিল শ্বাপদসঙ্কুল। প্রায়ই অযোধ্যা, দলমা থেকে আগত হানাদার জন্তুর কবলে পড়তে হতো এদের। কাজেই অস্তিত্বের জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে আত্মরক্ষার কৌশল রপ্ত করে নিজেরা। অনুরূপ কসরত শিক্ষা দেওয়া হয় গৃহপালিত পশুদেরও। একবিংশ শতাব্দীর গোরুখুঁটা সেই কসরত শিক্ষারই একটি পরিবর্তিত রূপ। প্রচলিত অহিরাতেও এমন ইঙ্গিত মেলে- *”ভালা অহিরে…. কপিলাকর পুতা ভালা, সিসু বালকঅরে, বাবু হো…. মহিষাকর পুতারে ডামাল, বাঘেকর পুতা ভালা, অতি বলীয়ান হে, রগড়ি ধরতে ধেনু গাই রে….”*। যে গরু বা কাড়া বেশি বার ঘুরতে ঘুরতে চামড়াটি কে তার শিং দিয়ে গুঁতা মারতে থাকে সেই গরু বা কাড়াটিকে শ্রেষ্ঠ বলবান হিসেবে ঘোষণা কর হয়। গরু কাড়াটির পাশাপাশি তার বাগাল ও মালিকের কৃষকমহলে সুনাম বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় থাকে পুরস্কারের ব্যবস্থা। স্বভাবতই এই সুনাম অর্জনের জন্য একটা প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতাও চলে এই ‘গরু খুঁটা’-এর মধ্য দিয়ে।

 

*তৃতীয়াতে পালিত নেগাচার*

*কাঁটা কাড্‌হা* : বাঁদানা পরবের মূল অনুষ্ঠানটি তিন দিনের হলেও তৃতীয়া তিথির দিনটি ‘কাঁটা কাড্‌হা’’ হিসেবে পালিত হয়। এদিন কোনো অনুষ্ঠান বা সংস্কার নেই। কেবলমাত্র বিকেল বেলায় গরু খোঁটানোর অনুষ্ঠানটি হয়। যেহেতু গরু এবং তার প্রতিপালক বাগালদের কেন্দ্র করে এই পরব, তাই রাখাল বাগাল দের আনন্দ-ফুর্তিকে আর একদিন উপভোগ করতে বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। পরবের কয়েকদিন পরেই মাঠে মাঠে ধান পেকে যাবে তখন ধান কাটা, ধান ঝাড়াই মাড়াই ইত্যাদি নানাবিধ কাজে জড়িয়ে যাবে গবাদিপশু ও তার বাগালরা তাই যতটা সম্ভব তাদের আনন্দ ফুর্তিটাকেই একদিন বাড়িয়ে নেওয়া হয়।

অনার্য্য সভ্যতার প্রতিনিধিদের একান্ত নিজস্ব বাঁদনা পরবের স্মৃতিটুকু বেঁচে থাকে মনের গভীরে। প্রবহমান সময়ে সুবর্ণরেখা, কংসাবতী, দামোদর নদীতে বহু জল গড়িয়েছে। কুড়মি জাতির উপর, কুড়মালী ভাষা, সংস্কৃতির উপর, সারনা ধরমের উপর সময়ে সময়ে বহু ঘাত প্রতিঘাত এসেছে , তথাপি কুড়মি জাতি তার নিজস্ব জাতিসত্ত্বা, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম অক্ষত অবস্থায় বুকে আঁকড়ে রেখেছে। প্রত্যেকেই বদ্ধপরিকর বর্তমান বঞ্চনা, প্রহসনের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন ভোর দেখতে। এবং এতদিন ধরে যে কুড়মী সম্প্রদায়ের সাথে প্রহসনের খেলার সাথে সাথে এক প্রচ্ছন্ন অন্ধকারে রেখে জল-জমি- জঙ্গল আত্মসাৎ করা হচ্ছে, তার অবসানের স্বপ্ন আজও দেখে প্রত্যেক কুড়মি মানুষ।

লেখা পাঠাতে পারেন