জ য় ন্ত    কু মা র    ম ল্লি ক-র একটি ধারাবাহিক গদ্য– অথ নেকড়ে-মানব-মানবী কথাঃ গল্প বনাম সত্যি ঘটনা (একাদশ পর্ব)

পরিচিতিঃ জন্ম- ১৯৫২, হুগলী শহর শিক্ষাদীক্ষাঃ স্নাতক- কবি, স্নাতকোত্তর- ববি; গবেষণাপত্রঃ উত্তরবঙ্গ উপ-হিমালয়ের বনবস্তির আর্থ-সামাজিক সমীক্ষা; প্রাক্তনী- বন্যপ্রাণ শাখা, বনবিভাগ (১৯৭৬-২০১২); জীববৈচিত্র্য-বাস্তুসংস্থান বিষয়ে গ্রন্থকার, জার্নাল-পর্যালোচক; দেশবিদেশে প্রকাশনা ১৪০। মুক্তির সন্ধানে সঙ্গীত চর্চা। বাইফোকালিজম্-র পাতায় আজ তাঁরই ধারাবাহিক গদ্য।

জ য় ন্ত    কু মা র    ম ল্লি ক-র একটি ধারাবাহিক গদ্য(একাদশ পর্ব)

 

অথ নেকড়ে-মানব-মানবী কথাঃ গল্প বনাম সত্যি ঘটনা
একাদশ পর্ব

 

নেকড়ে সংরক্ষণঃ

ভারতে প্রায় ১১টি অভয়ারণ্য রয়েছে যেখানে আপনি একটি বন্য ভারতীয় নেকড়ে দেখতে পারেন। কিন্তু শুধু ভারত নয়, এশিয়ার একমাত্র নেকড়ে অভয়ারণ্য ঝাড়খন্ডের মহুয়াডার, ৬৩.২৫৬ বর্গ কিলোমিটার ব্যাপী এলাকা জুড়ে রয়েছে এটি। এর উচ্চতা প্রায় ৬০০ মিটার। এই অভয়ারণ্যটি তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিহারের এক জবরদস্ত বনাধিকারিক। রাজধানী রাঁচি থেকে ১৯৮ কিমি দূরে চেচরি উপত্যকায় অবস্থিত এই অভয়ারণ্যের পূর্বে নেতারহাট পাহাড়, পশ্চিমে বুরহা পাহাড়, উত্তরে আকসি পাহাড় এবং দক্ষিণে চম্পা পাহাড়। বিহার সরকার ১৯৭৬ সালের ২৩শে জুন তারিখে মহুয়াডারকে একটি অভয়ারণ্যের মর্যাদা দিয়েছিল এবং এটি বেতলা জাতীয় উদ্যান (পালামু টাইগার রিজার্ভ) প্রশাসনের অধীনে রয়েছে। অভয়ারণ্যে ২৫টি সংরক্ষিত বন রয়েছে যা ছত্তিশগড় রাজ্যের সাথে সীমান্ত নির্ধারণ করে। এখানে বুরহা নদী প্রবাহিত হয়ে পরে আস্কি নদীর সাথে মিলিত হয় এবং অবশেষে কুজরুমের কাছে উত্তর কোয়েল নদীর সাথে মিশেছে।

নেকড়েরা সাধারণত অভয়ারণ্যের বনাঞ্চলের মধ্যে নির্মিত প্রজনন এলাকায় আসে শীতকালে। মহুয়াডার রেঞ্জে প্রায় ৮০টি নেকড়ে রয়েছে এবং তারা বংশবৃদ্ধি করে এই অভয়ারণ্যে। এখানে নেকড়ে বাচ্চাদেরও দেখা গেছে। কিন্তু আশপাশের গ্রামের ছেলেরা এবং রাখালরা নেকড়েদের আস্তানায় আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে বিরক্ত করায় নেকড়েরা এইসব প্রজনন এলাকা পরিত্যাগ করে নিরুপদ্রব এলাকায় বংশবৃদ্ধি করছে।
অক্টোবর থেকে জুন মাস (সকাল ৬টা-বিকেল ৪টে) মহুয়াডার নেকড়ে অভয়ারণ্য দেখার সেরা সময়। নেকড়েরা সাধারণত প্রতি বছর অক্টোবর থেকে নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে অভয়ারণ্যের বনাঞ্চলের মধ্যে তৈরি প্রজনন ঘাঁটিতে যায়। বর্ষাকালে অভয়ারণ্য বন্ধ থাকে।
নেতারহাট মহুয়াডার নেকড়ে অভয়ারণ্যের থেকে ৬০ কিমি দূরত্বে অবস্থিত। এর নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হল বারওয়াদিহ জংশন (স্টেশন কোড: BRWD), ৯৫ কিমি দূরত্বে অবস্থিত। মহুয়াডার এবং আস্কিতে বন বাংলো পাওয়া যায়।
একজন ভারতীয় বনসেবা আধিকারিক, সুরেশ প্রসাদ শাহী (যাঁকে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল ‘নেকড়ে মানব’), ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে বুঝতে পেরেছিলেন যে বাঘের সংগে সংগে নেকড়েরাও নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে দেশ থেকে।

তাঁর প্রবন্ধ শিরোনাম ‘Quo vadis, Canis lupus?’ স্যাংচুয়ারী পত্রিকার জানুয়ারী-মার্চ, ১৯৮২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে তিনি লিখেছিলেন-
They came silently out of the dark. The three grey shadows suspiciously circled my hide and the baited goat we had tied a few hours earlier. Thirty years of forest service had still not prepared me for my first encounter with Canis lupus in the wild. I was scared. I had learned to anticipate the reactions of leopards and tigers, but wolves were an unknown quantity. Besides, alone in the late hours of the evening, all the stories I had heard of wolf attacks on man seemed very real. Soon however they vanished – as silently as they had appeared. The animals must have sensed my human odour from a distance, with their amazing olfactory powers. And wolves have good reason to avoid man after the endless years of persecution that we have inflicted on them.
For some hours after they left, I stayed in my hide listening to the eerie, high-pitched howling that had begun in the distance. They never took the bait and I got no photographs, but that first brief encounter with the grey wolves of the Mahuadanr Valley in the Palamau District, on a cold, winter night in 1973, deepened my resolve to know more about the plucky ancestors to mans best friend – the dog.
উপদ্বীপীয় ভারতে নেকড়ে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা দেয় এবং বেশিরভাগই রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার-ঝাড়খন্ড রাজ্যে বিচ্ছিন্ন পকেটে পাওয়া যায়। আর কিছু আছে উত্তর প্রদেশ, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ এবং হরিয়ানা। শাহী (১৯৮২) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর সফরের সময়, উপদ্বীপীয় ভারতে প্রায় ৫০০-৮০০ নেকড়ে থাকার কথা জানিয়ে ছিলেন। ভারতীয় নেকড়েদের ওপর বেশিরভাগ গবেষণা পশ্চিম এবং দক্ষিণ ভারতে কেন্দ্রীভূত, তবে ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু বিক্ষিপ্ত সমীক্ষা ছাড়া পূর্ব ভারত থেকে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি। দেখা গেছে একটি প্রজনন গোষ্টির জন্য ১৫০ (+১৫) বর্গ কিমি গড় অঞ্চল লাগে, আর ভারতে সম্ভবত ১,২০০-১,৮০০ নেকড়ের দল রয়েছে যা বাস্তবসম্মত হিসাব বলে মনে করা হয়।
২০ শতকের শুরু পর্যন্ত, উত্তর প্রদেশ এবং বিহারের বিস্তৃত পরিসরে নেকড়েদের উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়। যদিও বিহারে এর সংখ্যা রাজ্যের দক্ষিণ অংশে সীমাবদ্ধ। নেকড়ে একসময় বিহার-ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশে (পশ্চিম চম্পারণ, ভাগলপুর, গয়া, দারভাঙ্গা, মুঙ্গের, পূর্ণিয়া, সরণ, সহরসা, পালামৌ এবং হাজারিবাগ জেলা) অনেক দেখা যেত। কিন্তু অধিক মানব-নেকড়ে সংঘর্ষের কারণে ১৯৯০-এর দশকে অনেক এলাকা থেকে নেকড়ে নির্মূল হয়ে গিছল। যাই হোক, তরাইয়ের প্লাবনভূমি এলাকার তৃণভূমিতে নেকড়েদের উপস্থিতির ইঙ্গিতবহ কিছু সূত্র পাওয়া গেলেও ভারত ও নেপালের তরাই অঞ্চলে বা গঙ্গার উত্তরভাগে ভারতীয় নেকড়েদের উপস্থিতির কোনো নিশ্চিত নথি নেই। পরে (২০১০) গঙ্গার উত্তরে গন্ডক নদীর (বিহার) প্লাবনভূমিতে ভারতীয় নেকড়ের নিশ্চিত উপস্থিতির কথা জানা গেছে। সাম্প্রতিককালে (জানুয়ারী, ২০১৭) বিহারের উত্তরে নেপাল সংলগ্ন বাল্মিকী ব্যাঘ্র প্রকল্পের ক্যামেরার ফাঁদে নেকড়ে ধরা পড়েছে।
এস.পি. শাহী (১৯১৭-১৯৮৬) ১৯৪২ সালে বিহার বন বিভাগে যোগদান করেন, ১৯৬০ সালে দেশের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান বন সংরক্ষক হন, ৪৩ বছর বয়সে। স্বাধীনতা পরবর্তী সর্বশক্তিমান এবং রাজনৈতিকভাবে পরাক্রমশালী জমিদারদের কাছ থেকে বিহারের ব্যক্তিগত জমিদারির বন দখল করেন। বিহার ও ঝাড়খণ্ডের অধিকাংশ বন্যপ্রাণ সংরক্ষিত অঞ্চল তৈরির জন্য এককভাবে লড়ে গেছেন, ১৯৬৮ সালে বিহারে সমস্ত শিকার (শুটিং) ব্লক বাতিল করেন দেশব্যাপী শিকার নিষিদ্ধ হওয়ার ২ বছর আগে)। তিনি বিহারের বন্যপ্রাণীর ওপর একমাত্র নির্দিষ্ট বইয়ের লেখক (ব্যাকস টু দ্য ওয়াল: সাগা অফ বিহারের বন্যপ্রাণী, ১৯৭৭)।

শাহী ১৯৮৬ সালে মারা যান এবং মহুয়াডার শীঘ্রই বিহারের বেশিরভাগ বন প্রশাসকদের মানচিত্র থেকে ছিটকে পড়ে, অযত্নে অসুরক্ষিত হিসাবে থেকে যায়। ছাগল পালনকারী গ্রামবাসীরা মহুয়াডার উপত্যকায় অবাধে প্রবেশ করতেন। কিছু অসন্তুষ্ট গ্রামীণ/ছাগল-পালকরা প্রাপ্তবয়স্ক নেকড়েদের বিষ খাইয়ে এবং নেকড়ের ছানাদেরকে তাদের গুহায় ধূঁয়ো দিয়ে মেরে ফেলার ঘটনাও বিরল ছিল না, শাহীর সময়ে এবং তার পরেও। যাই হোক, সামগ্রিকভাবে, নেকড়েরা তাদের নিজেদের পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যদের সংখ্যা ধরে রাখতে পেরেছিল এবং পশুপালকদের বেশিরভাগই নেকড়েদের দ্বারা একটি ছাগল বা একটি শূকর তুলে নেওয়ার বিষয়ে খুব আপত্তি ছিল না। নেকড়েরা যেমন মানিয়ে নিয়েছে তেমনি গ্রামবাসীরাও মাঝে মাঝে তাদের অভিযান সহ্য করেছে। একবিংশ শতাব্দীতে বন বিভাগ আবার মহুয়াডারের নেকড়েদের ওপর নজরদারি শুরু করেছে, এবং নেকড়েদের ডেরার ওপর নজরদারি পুনরায় চালু করা হয়েছে। ক্যামেরা ট্র্যাপিং ২০১২ সালের দিকে শুরু হয়েছিল এবং তারপর ১৯৭০-এর দশকে শাহীর প্রথম সাদা-কালো ছবি তোলার পরে মহুয়াডারে অধরা নেকড়েদের প্রথম রঙ্গিন ছবি প্রকাশ করেছিল। শেষ গণনা অনুসারে মহুয়াডারে ১৫০টির মত নেকড়ে রয়েছে।
শাহীই প্রথম বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী যিনি ৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে মহুয়াডারে ভারতীয় নেকড়ের শিকারের


(একটি টোপযুক্ত ছাগল) প্রতিকৃতি তুলেছিলেন।

আগেই বলেছি যে মেদনিপুরের কমলা এবং অমলার বয়স অনুমান করা হয়েছিল যথাক্রমে আট এবং সাড়ে ছয়। তাদের সেই বয়সের শিশুদের মতই দেখাশোনা করা হত। তাদের কোন ভাষা ছিল না এবং সঠিক ভাবে বলতে গেলে তাদের প্রকৃতি ছিল সম্পূর্ণরূপে একটি প্রাণীর বা সঠিকভাবে বলতে গেলে নেকড়ের মত।
একটি বিখ্যাত ড্যানিশ প্রবাদ রয়েছে- “নেকড়ের পালের সাথে বসবাস করো, তুমি বিড়াল হলেও একদিন গর্জন করতে শিখবে”।
খুব ভুল নয় কথাটা। কমলা এবং অমলা প্রাণীজগতের এবং জীবনের প্রকৃতি প্রায় পরিপূর্ণভাবে শিখে ফেলেছিল। এই পরিবর্তন অর্জিত, এবং এখনও পর্যন্ত, একটি স্থায়ী অভ্যাসে পরিবর্তিত হয়েছিল, যার থেকে বেরিয়ে আসা তাদের পক্ষে খুব সহজ ছিল না। আমরা তাদের কার্যত বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি, কারণ তাদের বোঝার মতো আমাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে এই ধরনের পরিবর্তন ঘটার জন্য বা অভ্যাস তৈরির জন্য তাদের অনেক কষ্ট ও অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

নেকড়ের এইসব অভ্যাস পাল্টানোর জন্য পরবতী কালে তাদের ওপর কি কি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল সেসব বলব পরবর্তী পর্বগুলোতে।

ক্রমশঃ

লেখা পাঠাতে পারেন

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিংকে

জ য় ন্ত    কু মা র    ম ল্লি ক-র একটি ধারাবাহিক গদ্য(দশম পর্ব)–“অথ নেকড়ে-মানব-মানবী কথাঃ গল্প বনাম সত্যি ঘটনা”