দু র্গা প দ    চ ট্টো পা ধ্যা য়-র কবিতাগুচ্ছ

0
53
পরিচিতিঃ প্রবন্ধকার ও গবেষক দুর্গাপদ চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে রাঢ় মাটির দেশ বাঁকুড়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে ৷ গ্রামের নাম তেলেন্ডা ৷ চাকুরী ও রবীন্দ্র অনুসন্ধিৎসা নিয়ে কলকাতায় আসেন সত্তরের দশকে ৷ লেখালিখির সেই শুরু ৷ ‘ বর্তমান ‘ সংবাদপত্রে ধারাবাহিক ও রেডিও নাটক দিয়ে লেখালিখির হাতেখড়ি ৷ লেখক এ যাবৎ চল্লিশটির বেশি বই লিখেছেন ৷ তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে ‘ নরবলির ইতিহাস ‘, ‘ রামায়ণের বাল্মীকি ‘, ‘ সংস্কৃত সাহিত্যে বারাঙ্গনা ‘, ‘ অজানা অচেনা মহাভারত ‘, ‘ মিথ্রিডেটিজম ও ইতিহাসের বিষকন্যা ‘, ‘ শরৎচন্দ্রের জীবনে নারী ‘, ও রবীন্দ্র- বিষয়ক গ্রন্থ – ‘ রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির ইতিবৃত্ত ‘,’ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু চেতনা ‘, রবীন্দ্রনাথের বিষাদযোগ ‘, ‘ অচেনা রবীন্দ্রনাথ ‘, অচেনা অজানা রবীন্দ্রনাথ ‘, ‘ রবীন্দ্রনাথের বিবাহবাসর ‘, ‘ রাণুর রবীন্দ্রনাথ ‘, ‘ রবীন্দ্রনাথের নতুন বৌঠান ‘ ও শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু রহস্য বিষয়ক ‘ শ্রীচৈতন্য : অনন্ত জীবনের সত্যাণ্বেষণ ‘, ( দে’জ পাবলিশিং সং ও ‘ Storytel ‘ নির্মিত ওডিও বুক ) বইগুলি ইতিমধ্যে বিদ্বৎসমাজে সমাদৃত হয়েছে ৷ বাইফোকালিজম্-র পাতায় আজ পাঠকদের জন্য তাঁরই গুচ্ছকবিতা 

দু র্গা প দ    চ ট্টো পা ধ্যা য়-র কবিতাগুচ্ছ

 সই

বিষের মতন অন্ধ ছিল , সুধার মতো বোকা
তখন সবে সেমিকোলন দাঁড়ি কমায় একা।

স্পর্শ ছুঁলে জৈব হতো , অ্যালার্ম ছিল খামে
অনাবরণ অক্ষরেরা চিঠির ভেতর ঘামে।

নুন মরিচের বন্ধু ছিল , তেঁতুল পাতায় আড়ি
কানের কথায় ঠোঁট ছোঁয়ালে অমনি ছাড়াছাড়ি।

অরূপ ছিল কাঙাল ছিল , বিভুঁই ছিল ঘ্রাণে
বন্ধু হবার ঋণ নিয়েছি মনখারাপের টানে।

মৃত্যুরা সব আয়ুধ হলে, নগ্ন যেমন ডাকে
অমূর্তরা মূর্ত হতো বিমূর্ততার ফাঁকে।

ইচ্ছে ছিল ব্রেইল দিয়ে লিখবো কারোর নামে
ছৈ হারানো চিঠিরা সব থৈ হারাতো খামে।

পথের মতো পথিক ছিল চরতো পথে ঘাটে
চুমুর মতন লজ্জা হতো মলচেপড়া ঠোঁটে।

নিবিড় খুলে আয়না দেখি , ইলিশেগুঁড়ি জ্বরে
ঘুমের নূপুর জেগেই আছে পায়ের অগোচরে।

চাদর ছিল ভুলের মতন, আদর ছিল খামে
বেয়ারিঙে আসতো চিঠি ডাকপিয়নের নামে।

গোলাম বিবি টেক্কা ছিল , ছুঁইনি শুধু তাস
দেখার ক্যালেন্ডারে ছিল চোখের বারোমাস।

বর্ষা হলে ভিজতো কদম , সিক্ত হতো ঘ্রাণে
তরল জলে সরল হতো ভূগোল বইয়ের মানে।

ইচ্ছে ছিল মিস্টি করে নোনতা স্বাদে ডাকি
পার ছিলনা ধার ছিল যে ভাবতো যদি ফাঁকি।

পথিক ছেড়ে পথ হয়েছি , খুঁজছি যে টৈ টৈ
শত্রু হলেও বন্ধু ছিল ঋণখেলাপি সই।

বেহুলাসুন্দরী

নদীর তরল নিলে যেটুকু নির্যাস থাকে জলে তাই দিয়ে শোধ হয় বোতামহীন ঘুমের খরচ। এখানে ভ্রমণ খুব শ্লথ নয় ফোঁটা ফোঁটা পথিকের মতো। চিনি ছাড়া অন্ধকারে পাতাহীন ভিজেছিল যারা কুচি কুচি নগ্নতায় হাতে বোনা ঘামের মতন তারা খুব ধু ধু নয় উঁচু উঁচু দোভাষী অসুখে।

যেটুকু জমেছে ঋণ সস্তায় মাখামাখি হয়ে কাঁচুমাচু অন্ধকারে পেটরোগা চাঁদের মতন তার ভুল দেখা যেতো গোলগাল আনাড়ি জড়ুলে। ঘুমন্ত শব্দের মতো ঠিকানার ভয় ছিল নিবুনিবু রিটার্ন টিকিটে।

মিইয়ে যাওয়া অসুখের এইসব ত্রস্ত বোঝাপড়া বড়ই ধূসর ছিল আলতা পরা নিঃশ্বাসের মতো। ঢিপঢিপ ভয় ছিল দ্বিখণ্ডিত কিচিরমিচিরে । ঘনিষ্ঠ শূন্যর কাছে এইভাবে এসেছে হরিণ।

যেন বালকের হালখাতা আর সময় ফুটেছে গাছে গাছে। এলেবেলে পা ডুবিয়ে বসে আছে পুকুরের জল। গুঁড়ো গুঁড়ো মহাশূন্যে মিশে গ্যাছে ঘুড়ির সুঘ্রাণ। এখানে হ্যামলিন কোন বাঁশি নয় ইঁদুরের মতো। হেলমেটে লেগে আছে নার্সিসাস জলের কার্নিশ।

এখানে ঘড়িরা বেশ মিথুন লগ্নের মতো আলগা হয় সময়ের কাছে। ঘুমেদেরও ঘুম পায় বাইফোকাল আয়ুুর মতন। এখানে পথেরা খুব পথ ভুলো ছিপছিপে পথিকের মতো। নদীরাও চাপাকলে জল খেতে আসে।

মৃত্যুর কাতুকুতু। নিরীহ পংক্তির মতো হিমঘরে লেগে থাকা বেহুলার ওম। শূন্যের পলস্তারা খসে এভাবেই জন্ম হয় দিগন্তের ঋণ। ম্যানিকিওর-পেডিকিওর। যেভাবে মান্দাস চায় ভিজে যাওয়া বেহুলার লখিন্দর জলে।

 পিছুটান

উঁচু নিচু নিরুত্তর। এখানে গহন হলে ভূগোলেও বৃষ্টি হয় নিজস্বী ছবিতে। কিছুটা নাবাল বেয়ে যে পথটা চলে গ্যাছে নিবু নিবু আপেলের ডাকে-এখানে সাকিম হলে ফুটব্রিজে নেমে আসে ভ্রমণ প্রস্তাব। বহুক্রোশী উপমায় শ্বাস নেয় নরম বিশ্বাসে।

এখানে সমুদ্র খুব দীর্ঘ নয়। আকাশেরও পাট্টা আছে ক্ষতির হিসাবে । চারিদিকে ঈশ্বরের ক্ষেত। আর ধুধু শুধু দুইঘর দশপঁচিশ গুটির মতন। যেন জ্যোৎস্নায় ভিজে গেলে সব দাগ মুছে যায় বাদাামি অসুখে।

মিয়ানো শূন্যের কাছে অংকের ঘনত্ব যতো দূর। বা অবিন্যস্ত হিমাঙ্কের সব গল্প শেষ হলে যেভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ভূতুড়ে কাঙাল নিজস্ব মৃত্যুর কাছে আয়ু নেবে বলে। অজটিল নির্মাণের গিমিক ছিলনা তার পলিথিন বালিকার মতো।

এখানে সরল জলে নদী নামে ডুবে আছে জাহাজি নিঃশ্বাস। দিগ্বিদিক প্রশ্ন তার মৃতপ্রায় জিজ্ঞাসার মতো। আর অন্তহীন জন্মান্তরে মিশে গেছে সমবেত মাছের সংলাপ।

এই যে উত্তরে ঘেঁষা গোত্রহীন পৌরাণিক ভয়। ঘণীভূত টেলিফোনে বেজে ওঠা মেঘের সংলাপ। রোদ্দুরে জড়িয়ে যাওয়া পা থেকে ভেসে আসা হরিণের ঘ্রাণ-এইসব শূন্যের ভেতরে ত্রিকোণ ঋণের মতো শর্ত নামে জেগে থাকে কেউ।

মেরুন রঙের এই বনসাই বৃষ্টিতে ভিজে কবিতাও জ্বর হয় কবির গোপনে। এখানে আকাশ জমে সচকিত নিয়নের মতো। নক্ষত্রের হাই ওঠে। শূন্যেরও ঘুম পায় দড়িছেঁড়া কসমিক ছুঁয়ে।

জ্বর

কি নিমেষে এসেছে সোহাগ। যেন শূন্যতার সব ঋণ পার হলে পদছাপে পুণ্যি হয় ভিখিরি ধুলায়। চতুর্দিকে ছড়ানো আয়ুধ। অন্নকূটে জেগে আছে ভয়। সব শূন্য দীর্ঘ হয় হিরন্ময় সম্ভ্রমের আগে।

এই যে ফড়িংবোধ। ঠিকানায় শব্দহীন প্রতিটি উন্মাদ। নিষিদ্ধ ও বাদামি রঙে লেগে থাকা তন্ময় অসুখ। ছোট ছোট নগ্নতার অসীম স্পন্দন ঘিরে এই যে বোধন। স্তবগান। অনাবৃত বেআব্রু নিঃশ্বাস। সব শূন্য পার হলে এভাবেও শূন্যে আসা যায়।

যেন শর্তহীন জড়ুলের মতো সব শব্দ বসে আছে অভিভূত কলঙ্কের পাশে। পলাশ- তন্ময় থেকে চৈত্রের নিলাম যতো দূরে তারও চেয়ে কাছে পাবে যাত্রীহীন ঠোঁটের বিশ্বাস। ফেরারি জড়ুলে হয় বিজ্ঞাপিত চিবুকের দাগ।

চারিদিকে অনন্ত বাতাস। তুমুল আড়াল থেকে মৌন ভেঙে পড়েছে জ্যোৎস্নায়। এভাবেও জ্বর হয় চাঁদে । দো-হারা বৃষ্টির মতো ম্যাগনোলিয়া ঝরে যায় শুনশান তামস হরিণে।

ওপারে আকাশগঙ্গা এপারে নেবুলা। চারিদিকে শব্দচিত্র ধ্বনিময় জলজ সংলাপ। জাগতিক মগ্নতায় শুয়ে আছে সালোকসংশ্লেষ। খণ্ড খণ্ড হাইকুতে ডুবে আছে সমবেত রাত।

এইসব স্নানঘরে জমে থাকা ব্যক্তিগত মহাশূন্য নিয়ে আমাদের শীত আসে অন্তহীন লবনের ডাকে। চর্যাপদে জ্বর হয় নিঃসঙ্গ কুমকুমে।

জন্ম জ্বরা মৃত্যু নিয়ে এইভাবে বেঁচে ওঠে নিজস্ব চন্দন। দুইবার কড়া নাড়ে। ঠকঠক – ঠকঠক। অলকাতিলকা হয়ে কখনও চিতায়।

চিত্রঃ ২

 নগ্নিক

এসো কলঙ্ক করি। শোধ দিই ঋণের মতন। আতপ্ত ক্ষমার মতো নগ্ন নামে খ্যাত হোক তার। অতুচ্ছ গোপন আর করুণার দিনলিপি দিয়ে যা কিছু ভাঙন ছিল ষষ্ঠেন্দ্রিয় নাভির মতন গচ্ছিত কান্নার টানে সব নদী ফিরে যাক নিরুপায় জলের শরীরে।

অযত্ন ভীরুর মতো সব চাঁদ বোকা হয় জরুরি জ্যোৎস্নায়। মুখস্তেরও ভুল হয় বৃষ্টির লতানো নিয়মে। সব স্নান ভিজে গেলে সব নদী ফিরে আসে ঘরে।

মায়ের সকাল ভেঙে স্তনের নাব্যতা যতো দূরে বড়ো মনে পড়ে সেই সব যানজট নারীদের কথা। খুচরো বসত পেতে বহুদিন জেগে আছি শ্লীলতার খোঁজে। যেন আদি অন্ত অহর্নিশ কুন্তলীনে ঢেকে আছে তোমার প্রলয়।

তুমি তো কৃপণ ছিলে লবনাক্ত হিসেবের মতো। যেন মাপহীন নগ্নতার অসীম ডিঙিয়ে চিলেকোঠা ছুঁই ছুঁই সব চোখ জমা আছে শব্দহীন তোমার কাজলে।

অনেক কার্নিশ আছে ঝুঁকে পড়া উশখুশের মতো। অনেক আগুন আছে জাতিঙ্গার পাখির অধিক। মাগ্গি হাওয়ার মতো সব শূন্য উড়ে যায় সিম্ফনির দামে বেটোফেন ঘ্রাণের মতন।

বিপুল গভীর ছুঁয়ে উপমার এই যে অসুখ ক্ষণজন্ম বিশ্বাসের দিশেহারা বোতামের মতো তার সাথে একবার দেখা হয় হরিণের পয়মন্ত ভুলে।

ভিক্ষার ধ্বনিত শরীর অদেয় কাঙাল হয়ে বারংবার ফিরে ফিরে আসে। কিছুটা পাপের মতো বাকিটা ঈশ্বর। কড়া নাড়ে-অবনী অবনী। আলোর অধিক এক অগ্রন্থিত নগ্নতার কাছে।

 শূন্য

ঈশান খোলা বাঁধবে কখন, চুলের ঝোড়ো ফিতে
কাগজফুলে মেঘ জমেছে ঠোঁটের আচম্বিতে।

ঝাঁপ ফেলেছে দোকানদানি, হল্লাগাড়ির ডাকে
নিঃস্ব ঋণের শূন্যেরা সব চাঁদের আলো মাখে।

নামতা পড়া চোখের মতন , বিঘৎ কাজল দাগে
পাগল হওয়ার তারিখ ছিল ক্যালেন্ডারের আগে।

নিমার মতো বাদাম ছিল , ইজের ছিল বলে
চিঠির মতো লিপিরা সব ডুবতো অথৈ জলে।

চতুর্দশী শুক্ল যেদিন, পাটভাঙাকে ডাকি
ভ্যালেন্টাইন- ভ্যালেন্টাইন ফড়িং রঙে আঁকি।

পুতুল পুতুল নোলক থাকে, নূপুর ষোলোআনা
সস্তা জ্বরের ওষুধ ছিল মাগগি দিয়ে কেনা।

সবাই বলে সাকিম কোথায় , কি নাম ছিল-তাই
যে পথে পথ নিজেই পথের পথিক হতে চায়।

নিঃস্ব ছিল শব্দ হবার, প্রশ্ন ছিল খামে
মুক্ত হলে ভিজতো বাঁধন ডাকপিয়নের নামে।

মায়ার মতো পিছল ছিল, নাবাল ছিল জমি
আকাশ ফুঁড়ে আসতো উড়ে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী।

পা ডুবিয়ে বসতো নদী, উড়তো হাওয়ার ঢেউ
স্রোতের মতো মুক্ত ছিল জলের মতো কেউ।

যোজন দূরের জীবন ছিল, মৃত্যু থেকে কাছে
সবার ভুলের অপেক্ষাতে কাঙাল কিছু আছে।

ভূগোল দিয়ে বাঁধলে আকাশ, শূন্য হতো মেঘে
সময় আজও ভিক্ষা করে ঘড়ির মতো জেগে।

লেখা পাঠাতে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here