বেনারসের ঘাটের গল্পঃ ব র্ণা লী   রা য়

লেখিকার পায়ের তলায় সর্ষে।আজ পুরুলিয়ার এই মেলাতে তো কাল ইতিহাসের হাত ধরে পৌঁছে যায় মুর্শিদাবাদের প্রাচীন রাজারাজড়ার কোনও অলিন্দে।”গরীবের ঘোরা রোগ” বারবার তাঁর তথ্য তত্ত্ব ও ভিন্ন দর্শনের হাত ধরে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তাঁর সম্প্রতি এই ছোট ছোট ভ্রমণের চোরাকুঠরির সমন্বয়ে বর্ণিক প্রকাশন থেকে সম্প্রতি “ভ্রমণ-যাপন১” শিরোনামে একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে।পাঠকরা সংগ্রহে রাখতে পারেন।চেনা পৃথিবীর অচেনা দর্শন।বর্ণালী বাইফোকালিজমের একজন অন্যতম সদস্যাও।

বেনারসের ঘাটের গল্প

লেখা ও ছবিঃ ব র্ণা লী   রা য়

 

মণিকর্ণিকা ঘাটের পাশের চায়ের দোকানে বসে থাকা দুটো মানুষের অপলাপ নাকি ধুলো মাখা স্মৃতির আস্তরণ সরিয়ে নিজের সাথে নিজের মুখোমুখি হওয়ার পালা জানা নেই। তবু সে সব কথার মাঝেই ঝড় ওঠে, সম্পর্ক ভাঙে-গড়ে আর গঙ্গার পবিত্র ধারা সাক্ষী থেকে যায় সেসবের।
কথিত আছে যজ্ঞাগ্নিতে সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেব যখন সতীর মৃতদেহ নিয়ে কল্পব্যাপী হেঁটে চলেছেন, বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডে খণ্ডে বিভাজিত করে দেন। সেই খণ্ডই যেসব স্থানে পড়ে সেগুলিই সতীপীঠ বলে খ্যাত হয়ে ওঠে। কাশীর একটি ঘাটে সতীর কানের রত্নমণি পড়েছিল, সেই থেকে ঘাটটি মণিকর্ণিকা ঘাট নামে খ্যাত। বিষ্ণুর তপস্যাস্থল এই ভূমি। মহাদেবের স্থান এই ভূমি। বলা হয় এই ঘাটের মৃতদেহের দাহ হলে পুনর্জন্মের চক্র, কর্মের চক্র থেকে মুক্তি পেয়ে আত্মা মোক্ষলাভ করে।

ইতিহাস, পুরাণ, বিশ্বাস, ধর্ম, সব মিলেমিশে আছে মণিকর্ণিকার তট জুড়ে। আরেকটু বিশদে বললে সহস্র পরিবর্তনেও রিচ্যুয়াল বয়ে নিয়ে যাওয়া বারাণসীর স্পিরিট। খোলা আকাশের নিচে মৃতদেহ পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া, উত্তরবাহিনী গঙ্গার পাশাপাশি বয়ে চলা। মিথ, ঐতিহ্য, আধুনিকতা জড়াজড়ি করে থাকা এক অদ্ভুদ শহর। ঘাটের শহর। যেখানে শিবের অভিষেকে বিষ্ণুর মন্ত্র উচ্চারিত হয়। যেখানে বিশ্বনাথ মন্দিরের ঘন্টার ধ্বনিতে মিশে থাকে জ্ঞানব্যাপী মসজিদের আজানের সুর।
বেনারসি না পড়লে বাঙালি মেয়ের বিয়ে হয় না। জয় বাবা ফেলুনাথে বেনারসের প্রতিটি অলিগলি চেনা। বেনারসী পান, গোধূলীয়া মোড়ের চায়ের দোকান, বাঙালি টোলার পথঘাট, বাঙালি বিধবাদের গতি স্থল সব কিছুতেই বড্ড চেনা শহরটা। প্রথমবার গেলেও মনে হয় বড়ই চেনা, খুব আপন এই শহর।
বেনারসের অষ্টআশিটি ঘাটই অনেক গল্প বলে যায়। দশাশ্বমেধ ঘাটে ব্রহ্মার দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞের গল্প শুনলেই বেনারসকে ইতিহাসের থেকেও অতীত এক তস্য প্রাচীন জনপদ বলে মনে হয়। মার্ক টোয়েনও কতকটা সেই কথাই লিখেছেন। ‘রাম চরিত মানস’-এর মতো গ্রন্থ তুলসীদাসজি বেনারসে বসে রচনা করেছিলেন। তুলসীদাস ঘাট সেই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে শতাব্দীর পথ বেয়ে। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ-এর প্রকৃত নাম মণিকর্ণিকা। বেনারসের পূণ্যভূমিতে তাঁর জন্ম। লক্ষ্মীবাঈ ঘাট তারই স্মারক। গঙ্গার বুক চিরে নৌকা নিয়ে যেতে যেতে দেখা যায় ঘাটগুলি একেক জন রাজা একেক সময় ঘাটগুলো নির্মাণ করেছিলেন। মারাঠা, সিন্ধিয়া, হোলকার, পেশোয়া না জানি আর কত শাসকের বিজয়গাঁথা বয়ে নিয়ে চলেছে ঘাটগুলি। হরিশচন্দ্র ঘাট থেকে নৌকা চলা শুরু হয়ে মণিকর্ণিকা ঘাট, চৌষট্টি যোগিনীর ঘাট, অহল্যা ঘাট, চেত সিং ঘাট, অসি ঘাট, কেদার ঘাট, গঙ্গামহল, তুলসী ঘাট, জৈন ঘাট, দশাশ্বমেধ ঘাট আরো কত প্রচলিত নাম না জানা ঘাট পার করে নৌকা এগিয়ে চলে অখ্যাত ঘাটগুলির গা ঘেঁষে। হয়তো মাঝিও ভুলে যায় অষ্টাশি রকমের নাম।


ক্লাস টুয়েলভের ইংরেজী বইতে অ্যাডলাস হাক্সলির লেখা ‘Eclipse in Benaras’ আমার মধ্যে এক দুরন্ত ফ্যান্টাসির জন্ম দিয়েছিল। হাক্সসির লেখা তাঁর এই ভ্রমণ বৃত্তান্তটি কিছুটা ভারতীয়দের প্রথা রীতিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে বর্ণনা করলেও, আমি কোন এক অজ্ঞাত কারনে সেইদিন থেকেই বেনারসের মোহে আবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। সত্যজিৎ রায়ের জয় বাবা ফেলুনাথের স্ক্রিনে মাগনলাল মেঘরাজের বজ্রা ভ্রমণের দৃশ্যটা কেমন যেন চুম্বকের কাজ করত। সেই বেনারসে দাঁড়িয়ে কিভাবে নিজেকে অচেনা বলি, অতিথি বলি। আমার মা বলতেন দাদু নাকি খোদ বেনারস থেকে শাড়ি কিনে এনেছিলেন তার মেয়ের বিয়ের জন্য। তাহলে যে শহর আমার জন্মের আগে থেকে আমার সাথে জুড়ে আছে তাঁর অলিগলি সব পথই আমার আপন।
নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে, বসে মুগুর ভাজা পালোয়ান, ছত্রধারী বাবাজি, ভষ্ম মেখে চাতালে শুয়ে থাকা নাগা সাধু, হরেক রকম মালা বিক্রি করা বৃদ্ধা আর তার মেয়ে কিংবা ঐ যে নাপিত একটা চেয়ার আর একটা আয়না নিয়ে অপেক্ষা করে পূণ্যার্থী খদ্দেরের– এদের সবাইকে নিয়েই বেনারসের ঘাট।ঘাটের পাশের সিঁড়ি চাতালের ধুলো সাক্ষী থেকেছে কত শত পুন্যাত্মার।ঘাটের পাশের অলিগলি,তার ঝুপ্সি দোকান ঘরে কেনাবেচা চলে প্রতিদিন।গলি, তস্য গলি পথ পেরিয়ে টুরিস্ট আর মহাদেবের বাহন নন্দি ষাঁড়ের সে কি আতিথেয়তা! মনোহারি দোকান,বেনারসি পানের মহল্লা,কস্তুরি আতড়ের গন্ধে মেতে ওঠে ঘাটের সকাল সন্ধ্যে।সকাল থেকেই তোড়জোড় চলে সন্ধ্যারতির। ধোয়া পোছা, প্রদীপগুলোকে সাজানো, আরো হরেক উপাচার। আর সন্ধ্যা সাতটা বাজলেই দশাশ্বমেধ ঘাট উপচে পড়ে জনসাধারণের ভীড়ে। ঘাটের প্রতিটি কোণ পূর্ণ হয়ে ওঠে দর্শনার্থীদের নিয়ে। হোটেলের ছাদ থেকে ছোটো নৌকা, বড়ো নৌকা, বজ্রা থিকথিক করছে লোক। মাইকে চলছে অবিরত মন্ত্রোচ্চারণ। ধূপ, ধুনো, আরতির জন্য প্রস্তুত সাতজন পুরোহিত। সাতজন সৌম্যকান্তি পুরোহিত যেন সত্যিই সপ্ত ঋষি– ভ্রম হয়! সংকল্পের পর দীপাগ্নি, ধুনো, চামর সহযোগে শুরু হয় প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিটের শো টাইম।বৈদিক মন্ত্রের এমপ্লিফায়ার ভার্সানে তখন মাতোয়ারা পরিবেশ। চারিদিকের ফ্ল্যাশের ঝলকানির মাঝে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ভক্তির সুবাস।হাই ভোল্টেজ শো টাইম পেরিয়ে মাঝিকে একশো টাকা ঘুষ দিয়ে গঙ্গার বুকে গভীর রাত থেকে ভোরের সূর্য পর্যন্ত ভেসে থাকার আনন্দ ভাগ করা মুশকিল। স কালের ঘাটের গল্প আর কোলাহলে চাপা পড়ে থেকে রাতের ঘাট আর চিতার দাউদাউ আগুন অচেনা অনুভব তৈরি করে।


বিখ্যাত কচুরি, ক্ষীর মালাই হোক কিংবা বিশ্বনাথ গুলির পান, জর্দা আর কস্তুরী দোকতা, উত্তরপ্রদেশের জনপদ হয়েও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বেনারসি শাড়ির ধারক-বাহক বেনারস দেশ থেকে বিদেশ সবার আকর্ষণের ক্ষেত্র। গলি ঘুপছিতে ষাঁড়ের উপদ্রব এঁড়াতে এঁড়াতে যে গলিটাতে ঢুকলাম দেখলাম যত এগোচ্ছি কাঠের স্তূপ বাড়ছে, বুঝলাম মণিকর্ণিকা ঘাটের দিকে এগোচ্ছি। দাড়িপাল্লায় কাঠ মাপা চলছে। সে কি হাঁকাহাঁকি, হৈ হুল্লোড়। কেউ যেন মারা গেছে বোঝার উপায় কৈ? এখন তো অনেক কাজ মৃতদেহকে ধরে ধরে গঙ্গার জলে স্নান করানো চলছে, অত সময় নেই ধীরে সুস্থে, পিছনে লম্বা লাইন মোক্ষ লাভের। ধোঁয়া উঠছে, দাউদাউ চিতা জ্বলছে। সে আগুনের শিখায় কালো হয়ে যাচ্ছে মন্দিরের দেওয়ালগুলো। চায়ের দোকানে বসে দেখছি ওদের ব্যস্ততা। জলদি আরো জলদি চিতাতে উঠাও। ডোমরাজা বাঁশ দিয়ে চিতার আগুনটাকে উস্কে দিচ্ছে। অগুনতি চিতা। সবাই মোক্ষের পিপাসু। চিতা জ্বলছে আর কোন এক এয়োতির আলতা পড়া পা চিতা থেকে তখনো বেড়িয়ে, কেমন যেন জীবন্ত একটা পা।

লেখা পাঠাতে পারেন